যাকাত কাদের উপর ফরজ জেনে নিন

যাকাত কাদের উপর ফরজ
যাকাত কাদের উপর ফরজ

যাকাত কাদের উপর ফরজযাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আল্লাহর উপর ঈমান আনার পর নামাজ ও যাকাত হলো ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কোরান মজীদে যেখানে নামাজের  কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার পরপরই যাকাতের কথা বলা হয়েছে। কোরআন শরীফে প্রায় ৩২ জায়গায় যাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইসলামে যাকাত গুরুত্ব অপরিসীম। যাকাত প্রদান করলে সম্পদ কমে না বরং বাড়ে। যাকাত আপনার অর্জিত ও জমাকৃত সম্পদ পবিত্র করে। যাকাত আদায়কারী ব্যক্তির পুরস্কার হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আখেরাতে মুক্তি এবং পরকালে  জান্নাত লাভ। 

যাকাত আদায়কারীর জন্য যাকাত প্রদান করাকে গরীবের প্রতি ধনীদের দয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্পদের নেসাব পরিমাণ যাকাত আদায় করা ‘দয়া নয়’ বরং ‘গরিবের হক’। যাকাত ধনী ও গরীবের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে আনে। ইসলামী শরীয়তমতে, সুষ্ঠভাবে যাকাত বণ্টন করা গেলে দারিদ্রমুক্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সমাজ পক্ষান্তরে রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।

আরো পড়ুনঃ যাকাত কাকে বলে? 

যাকাত কাদের উপর ফরজ 

যাকাত কাদের উপর ফরজ বা কত টাকা থাকলে একজন মানুষের উপর যাকাত ফরজ হয় এই বিষয়ে অনেকের মাঝে কৌতুহল রয়েছে। এমন অনেক মানুষ আছে কাদের উপর যাকাত ফরজ সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তবে উল্লেখ্য যে, যাকাত সবার উপর ফরজ নয়।  শুধুমাত্র ওই ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ যে আল্লাহ তা’আলা নির্দেশিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। যাকাত কাদের উপর ফরজ সেই সম্পর্কে নিচের সম্পূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো-   

মুসলমান হওয়া

যাকাত ফরজ হওয়ার ১ম শর্ত হলো মুসলিম হওয়া। অমুসলিম ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ নয়। যদি কোন ব্যক্তি নও মুসলিম হয় তাহলে যেদিন থেকে সে মুসলিম হবে সেই দিন থেকে তার উপর যাকাত ফরজ হবে যদি উক্ত ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়। উল্লেখ্য যে, পূর্বে অমুসলিম থাকা অবস্থায় তার সেই সময়ের সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হবে না বা যাকাত দিতে হবে না।

নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হওয়া

যাকাত ফরজ হওয়ার ২য় শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি কমপক্ষে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তলা রুপা কিংবা ওই সমমূল্যের অর্থ বা সম্পদের মালিক হয় তাহলে উক্ত ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ। 

নিসাব পরিমান সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে 

নিসাব পরিমাণ সম্পদ কোনো ব্যক্তির কাছে তার দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, ঘরবাড়ি, জামা-কাপড়, কৃষি সরঞ্জাম ইত্যাদি বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে।

ঋণগ্রস্ত না থাকা

কোন ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ নয়। কিন্তু ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি তার ঋণের টাকা পরিশোধ করার পর অথবা ঋণের সম্পদ পরিশোধ করার পর নিসাব পরিমান সম্পদ তার কাছে অবশিষ্ট থাকে তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে। 

নিসাব পরিমান সম্পদ এক বছর স্থায়ী থাকা 

নিসাব পরিমাণ সম্পদ কোনো ব্যক্তির নিকট পূর্ণ এক বছর স্থায়ী থাকতে হবে। যে সম্পদ কোনো একজন ব্যক্তির কাছে পূর্ণ এক বছর জমা থাকবে না তার উপর যাকাত দেওয়ার নিয়ম নেই। 

জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে 

কোন পাগল অথবা বুদ্ধি জ্ঞানহীন মানুষের যাকাত আদায় করার বিধান নেই অর্থাৎ তার উপর যাকাত ফরজ নয়। যিনি জ্ঞান সম্পন্ন, আকল আছে তার ওপরেই যাকাত ফরজ। 

বালেগ হতে হবে

অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা নাবালক এর উপর যাকাত ফরজ নয়। যাকাত ফরজ হতে হলে বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে।

আরো পড়ুন- যাকাত দেওয়ার নিয়ম

যাকাত কাদের উপর ফরজ FAQ

বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়? 

কোন ব্যক্তি যদি স্বর্নের দাম হিসেবে যাকাত প্রদানের জন্য নিয়ত করে তাহলে বর্তমানে সাড়ে সাত তোলা স্বর্নের দাম প্রায় ছয় লক্ষ টাকা।  সুতরাং তাকে প্রায় ছয় লক্ষ টাকার মালিক হতে হবে। আর কোন ব্যক্তি যদি রুপার বাজার দর হিসেব করে যাকাত দেওয়ার চিন্তা করে তাহলে রুপার বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী তাকে ষাট হাজার টাকার মালিক হতে হবে। অর্থাৎ ৬০ হাজার টাকার মালিক হলে তাকে যাকাত দিতে হবে। মুদ্দা কথা হলো আপনি যদি ৬০ হাজার টাকা হতে ৬ লক্ষ টাকার মালিক হয়ে থাকেন তাহলে আপনার উপর যাকাত ফরজ হওয়ায় আপনাকে যাকাত প্রদান করতে হবে। 

কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত ফরজ? 

যে সকল সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হয় সেগুলো হলো নগদ অর্থ, সোনা-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, পালিত পশু, কৃষিজ পণ্য ইত্যাদির ওপর যাকাত ফরজ। ওয়াকফ সম্পত্তি, সরকারি সম্পত্তি, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিস, বাড়িঘর ইত্যাদির ওপর যাকাত ফরজ নয়।

কৃষিজ ফসল, ফলমূল ইত্যাদির ক্ষেত্রে পূর্ণ এক বছর মালিকের দখলে থাকা শর্ত প্রযোজ্য নয়। এই সকল সম্পদ যখনই আহরিত হয় তখনই তার ওপর জাকাত উশর বা ধার্য হয়।

সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে। এ হিসেবে অতিরিক্ত মালের ওপরও যাকাত ফরজ হবে। যাকাত নগদ অর্থ দ্বারাও পরিশোধ করা যায় আবার সংশ্লিষ্ট মাল দ্বারাও পরিশোধ করা যায়।

কত গ্রাম স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হয়?

সাড়ে সাত তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম বা এর চেয়ে বেশি স্বর্ন থাকলে যাকাত দিতে হয়।

১ ভরি স্বর্ণের যাকাত কত ২০২৩?

যাকাত দেয়ার নিয়ম হচ্ছে শতকরা ২.৫ হারে বা ১০০ টাকাতে ২.৫ টাকা। বর্তমানে ১ ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১ লাখ টাকা সেই হিসেবে ১ ভরি স্বর্ণের যাকাত ২০২৩ হলো ২৫০০ টাকা বা এর সমপরিমাণ সম্পদ।

যাকাত কাদের উপর ফরজ নিয়ে শেষ কথা 

যাকাত কাদের উপর ফরজ এই বিষয় টি জানা প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য আবশ্যক। যাকাত একটি ফরজ ইবাদত। সুতরাং যাকাত কাদের উপর ফরজ এই বিষয় টি ভালো ভাবে জেনে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী প্রত্যেক নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্জনকারী মুসলিম ব্যক্তির যাকাত আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যাকাতের মর্মার্থ অনুধাবন করত: যাকাত আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Comment