ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলো কী কী জেনে রাখুন

ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ ধরা না পড়ার কারণে যখন ক্যান্সার একদম লাস্ট স্টেজে চলে যায়, তখন আর কিছুই করার থাকে না। ব্লাড ক্যান্সার অর্থ হচ্ছে, রক্তের ক্যান্সার। আমাদের শরীরে সর্বদা রক্ত চলাচল করে। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের হৃৎপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দিবে। ফলে, সাথে সাথে মৃত্যু। রক্তে যদি ক্যান্সার হয়, তবে একজন মানুষের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

কারণ, যত ধরণের ক্যান্সার রয়েছে, এর মাঝে ব্লাড ক্যান্সার অনেক ভয়াবহ। ব্লাড ক্যান্সারের কারণে প্রতি বছর আমাদের বাংলাদেশে এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই, ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ কী কী এগুলো নিয়ে আজ আপনাদের সাথে আলোচনা করবো। লক্ষণগুলো জানা থাকলে, এসব লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রোগ নিরাময় করার পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।

তো চলুন, ব্লাড ক্যান্সার কী, ব্লাড ক্যান্সার কেন হয়, ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলো কী কী এসব বিষয়ে আরও বিস্তর আলোকপাত করা যাক।

ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ
ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ

ব্লাড ক্যান্সার কী

রক্তের কোষগুলির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ব্লাড ক্যান্সার হয়ে থাকে। এটি কয়েক ধরনের হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে সাধারণ হল লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা এবং মায়েলোমা। যে কোনো বয়সে, যে কোনো জেন্ডারেরই লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা হতে পারে।

লিউকেমিয়া হল শ্বেত রক্তকণিকার ক্যান্সার। শ্বেত রক্তকণিকা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। লিউকেমিয়ার কারণে অস্থি মজ্জা অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করতে শুরু করে। এই অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয় না এবং তারা অস্থিমজ্জার লোহিত রক্তকণিকা এবং অনুচক্রিকা তৈরি করার ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়।

লিম্ফোমা হল লসিকা তন্ত্রের ক্যান্সার। লসিকা তন্ত্র হল আপনার শরীরের একটি অংশ যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। লিম্ফোমা সাধারণত লিম্ফ নোডগুলিতে শুরু হয়, যা আপনার শরীরের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট, বাদামী গোলাকার টিস্যু।

মায়েলোমা হল প্লাজমা কোষের ক্যান্সার। প্লাজমা কোষগুলি হল শ্বেত রক্তকণিকা যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। অ্যান্টিবডিগুলি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। মায়েলোমার কারণে অস্থি মজ্জা অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ তৈরি করতে শুরু করে। এই অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষগুলি অ্যান্টিবডির স্বাভাবিক উত্পাদনে বাধা দেয়, যা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং সংক্রমণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

ব্লাড ক্যান্সার কেন হয়

ব্লাড ক্যান্সারের কেন হয়
ব্লাড ক্যান্সারের কেন হয়

ডিএনএ রূপান্তর এবং মিউটেশনগুলি ব্লাড ক্যান্সারের প্রধান কারণ। যখন রক্তের কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে তখন ক্যান্সারের দেখা দেয়। তা ছাড়াও কিছু রাসায়নিকের কারণে অতিবেগুনী রশ্মি একজন ব্যক্তির ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। কিছু ক্যান্সার স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি এবং ডায়েটের কারণে হতে পারে।

আরও পড়ুন – গলার ক্যান্সারের লক্ষণ সমূহ

আরও সহজভাবে বললে, নানাভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের জিনের মধ্যে বা ক্রোমোজোমের ভেতরে মিউটেশন হতে থাকে। উক্ত মিউটেশন যদি সঠিকভাবে কাজ না করে এবং এটা যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে শরীরের মধ্যে যে অনকজিন নামক একটি জিন রয়েছে, সেটি অ্যাক্টিভেটেড হলে, তখন যে কোনো কোষ ব্লাড ক্যানসারে রূপান্তরিত হতে পারে। যেমন- আমরা বলতে পারি ডাউন সিনড্রোম যাদের হয়, তাদের ক্ষেত্রে ব্লাড ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

শরীরের কোনো একটি কোষে ক্যান্সার হলে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ফলে, এক অঙ্গের ক্যান্সার অন্য অঙ্গের ক্যান্সারে পরিনত হয়। সাধারণত যেসব কারণে ক্যান্সার হয়ে থাকে, এগুলো হচ্ছে –

  • বয়স: ক্যান্সার সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। প্রবীণ বয়সে অনেককেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। কারণ, ক্যান্সার হলেও তা সহজেই ধরা পড়ে না।
  • পারিবারিক ইতিহাস: যদি আপনার পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তাহলে আপনার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অর্থাৎ, আপনার পরিবারের কেউ যদি আগে থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে আপনার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অঙ্কাংশে বেড়ে যাবে।
  • ধূমপান: ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
  • অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কোলন এবং রেকটাল ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং মূত্রাশয় ক্যান্সার।
  • অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য: অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য, যেমন অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, লাল মাংস এবং ফাস্ট ফুড খাওয়া, ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কোলন এবং রেকটাল ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার।
  • অতিরিক্ত সূর্যের সংস্পর্শ: অতিরিক্ত সূর্যের সংস্পর্শ ত্বকের ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
  • কিছু ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া: কিছু ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া, যেমন হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV), হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এবং হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV), ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

উপরোক্ত কারণগুলোতে ক্যান্সার হয়ে থাকে। একবার ক্যান্সার হলে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ব্লাড ক্যান্সার হওয়ার অনেক আশংকা থাকে।

ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ সমূহ

ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলি রোগের ধরন, পর্যায় এবং এর প্রভাবের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলির মধ্যে সাধারণ কিছু লক্ষণ হচ্ছে :

  • ঘন ঘন জ্বর: আমাদের শরীরের তাপমাত্রা 100.4°F (38°C) বা তার বেশি হলে জ্বর বলে বিবেচিত হয়। ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। সংক্রমণ আপনার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। ঘন ঘন জ্বর হওয়া ব্লাড ক্যান্সারের একটি লক্ষণ।
  • অতিরিক্ত ঘাম: অনিয়ন্ত্রিত ঘাম ব্লাড ক্যান্সারের একটি সাধারণ লক্ষণ। ব্লাড ক্যান্সার হলে অতিরিক্ত ঘাম ছুটতে দেখা যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা।
  • অল্পতেই ক্লান্ত বোধ করা: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। সংক্রমণের কারণে আমাদের শরীরের শক্তি কমে আসে। ফলে, অল্পতেই আমরা ক্লান্ত বোধ করি।
  • ওজন হ্রাস: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আমাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। সংক্রমণ আমাদের শরীরের পুষ্টির মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে শরীরের ওজন কমে যায়।
  • অ্যানিমিয়া: রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে লোহিত রক্তকণিকা না থাকলে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, তাকে অ্যানিমিয়া বলে। লোহিত রক্তকণিকা অক্সিজেন পরিবহন করে, তাই যখন অ্যানিমিয়া হয়, তখন আমাদের শরীরের অঙ্গগুলি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। অ্যানিমিয়ায় সাধারণত ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট এবং মাথা ঘোরা দেখা দেয়।
  • অস্বাভাবিক রক্তপাত বা ক্ষত: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আপনার রক্তের কোষগুলি অপরিপক্ব বা অকার্যকর হতে পারে। এর ফলে রক্তপাত হওয়া, যেকোনো ক্ষত সহজেই নিরাময় না হওয়ার মতো অনেক সমস্যা দেখা যায়।
  • হাড়ে ব্যথা: রক্ত সারা শরীরে প্রবাহিত হয়। একটি অঙ্গে যদি রক্ত চলাচল বন্ধ হয়, তবে ঐ অঙ্গটি পচে যেতে পারে। কিন্তু, রক্তে যখন ক্যান্সার হয়, তখন আরও খারাপ পরিস্থিতি হয়। রক্ত চলাচল করে ঠিকই, কিন্তু শরীরের বিভিন্ন হাড়ে ব্যাথা হওয়ার মতো বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।
  • ফুসফুসের সংক্রমণ: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। ফুসফুসের সংক্রমণে কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং বুকে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
  • মাথা ব্যথা: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে মাথা ব্যথা হতে পারে। কারণ, রক্ত আমাদের পুরো শরীরের সঙ্গে মস্তিস্কেও রক্ত পৌঁছায়। রক্তে ক্যান্সার থাকলে তাই মাথা ব্যাথা সহ আরও অনেক সমস্যা দেখা যায়।
  • বমি বমি ভাব বা বমি: ব্লাড ক্যান্সার আমাদের পেট বা অন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, যার কারণে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
  • ত্বকের পরিবর্তন: ব্লাড ক্যান্সারের কারণে আমাদের ত্বকে ফুসকুড়ি, লালচে দাগ বা ক্ষত দেখা দিতে পারে।

উপরোক্ত ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলো যদি কারও ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়, তবে ধরে নিতে হবে যে ঐ ব্যক্তি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় আছে। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তার ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণগুলো দেখে যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে, তবে চিকিৎসা নিতে হবে।

এই লক্ষণগুলির মধ্যে কোনওটি যদি আপনার মধ্যে থাকে তবে আপনার ডাক্তারের সাথে দেখা করা গুরুত্বপূর্ণ। তারা আপনার লক্ষণগুলির কারণ নির্ণয় করতে এবং উপযুক্ত চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করতে পারেন।

Leave a Comment