প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ সমূহ কী কী জেনে রাখুন

প্রোস্টেট ক্যান্সার কী, প্রোস্টেট ক্যান্সার কেন হয় এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ কী কী তা নিয়েই আজকের এই পোস্ট। আপনাদের সাথে আজ প্রোস্টেট ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করবো। এটি এমন এক ধরণের ক্যান্সার, যা শুধুমাত্র ছেলেদের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। আপনি যদি প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ সমূহ জানতে চান, তবে পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়ুন।

যেকোনো ক্যান্সার আমাদের দেহের জন্য অনেক ক্ষতিকারক। ব্রেস্ট ক্যান্সার যেমন শুধুমাত্র মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তেমনি প্রোস্টেট ক্যান্সার শুধুমাত্র ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তো চলুন, প্রোস্টেট ক্যান্সার কী এবং কেন হয় জেনে নেয়া যাক।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ
প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ

ক্যান্সার কী

ক্যান্সার হল একটি গুরুতর অসুখ যা শরীরের কোষগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং বিস্তারের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। ক্যান্সার কোষগুলি স্বাভাবিক কোষ থেকে আলাদা, কারণ তারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এই অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন এবং ছড়িয়ে পড়া শরীরের ক্ষতি করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

ক্যান্সারের কারণে এখন অব্দি অসংখ্য মানুষ মারা গেছে। ক্যান্সার হলেই এটি ধরা পড়ে না। যখন ক্যান্সার একদম শেষ পর্যায়ের দিকে চলে যায়, তখন ধরা পড়ে এবং শেষ সময়ে করার মতো আর কিছুই থাকে না।

প্রোস্টেট ক্যান্সার কী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) অনুসারে, ফুসফুস ক্যান্সারের পর পুরুষ মানুষ যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, সেটি হচ্ছে প্রোস্টেট ক্যান্সার। প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পরেও সহজেই লক্ষণ দেখা যায় না। চিকিৎসকদের মতে, ৫০ বছর বয়স পেড়িয়ে গেলেই প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি।

শুধুমাত্র পুরুষদেরই প্রস্টেট গ্রন্থি রয়েছে। এর আকার অনেকটা কাজুবাদামের সমান। মুত্রথলির নিচ থেকে যেখানে মুত্রনালী বের হয়েছে সেটির চারপাশ জুড়ে এই গ্রন্থিটি বিদ্যমান। এর মধ্য দিয়েই মূত্র এবং বীর্য প্রবাহিত হয়। এই গ্রন্থির মূল কাজ হচ্ছে বীর্যের জন্য কিছুটা তরল পদার্থ তৈরি করা। যৌনকর্মের সময় যে বীর্য স্খলিত হয় সেটি আসলে শুক্রাণু এবং এই তরল পদার্থের মিশ্রণ।

এই প্রোস্টেট গ্রন্থিতে যখন ক্যান্সার হয়, তখন সেটিকেই প্রোস্টেট ক্যান্সার বলে। প্রোস্টেট ক্যান্সার যদি প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা যায়, তাহলে অনেক দ্রুত চিকিৎসা করে নিরাময় করা সম্ভব।

প্রোস্টেট ক্যান্সার কেন হয়

প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় যদি উক্ত ব্যক্তির পরিবারের কারও আগে থেকে প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার ইতিহাস থাকে। প্রথম-ডিগ্রি সম্পর্কিত আত্মীয় অর্থাৎ বাবা,জ্যাঠা বা মামা ইত্যাদি কারও যদি প্রোস্টেট ক্যান্সার থাকে, তবে উক্ত ব্যক্তির প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে, চিন্তার কিছু নেই। প্রাথমিক অবস্থায় প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়লে তা ৯৬% নির্মূল করা সম্ভব।

অতিরিক্ত ওজন বা স্থুল হলে এই ক্যানার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই, পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এতে করে প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে অনেকাংশে।

অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে যে, অধিক লম্বা পুরুষেরা খাটো পুরুষদের থেকে বেশি পরিমাণে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

ভ্যাসেকটমি(vasectomy) করানো পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।

অধিক পরিমাণে ধূমপান এবং মদ্যপান করা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবথেকে বেশি মাত্রায় থাকে।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ

প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ দেখে আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি যে, প্রোস্টেট ক্যান্সার হয়েছে কী না। প্রাথমিক অবস্থায় প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ দেখে যদি চিকিৎসা নেয়া হয়, তবে ৯৬% ক্ষেত্রেই এই ক্যান্সার নির্মূল করা সম্ভব হয়। কিন্তু, যখন এই ক্যান্সার বিশাল আকৃতি ধারণ করে, তখন তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই, এই ক্যান্সারের লক্ষণগুলো জেনে নেয়া আবশ্যক।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ হচ্ছে –

১. প্রস্রাবে সমস্যা হলেও মূত্রত্যাগের গতি কমে যেতে পারে। প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা কিংবা প্রস্রাব পেলে ঠিক ভাবে মূত্রত্যাগ করতে না পারা এই রোগের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ। পাশাপাশি, এই রোগে বড় হয়ে যেতে পারে মূত্রস্থলীর প্রস্টেট গ্রন্থির আয়তনও। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। তবে এ ধরনের সমস্যা মূত্রনালির সংক্রমণের কারণেও হতে পারে।

২. প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলে মূত্রত্যাগের সময় তলপেটে ব্যথা হতে পারে। মূত্রত্যাগের সময়ে ব্যথা হওয়া মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। এটি প্রস্টেট ক্যান্সারের অন্যতম একটি লক্ষণ। মূত্রত্যাগের সময়ে ব্যথা বা জ্বালা হওয়া একাধিক রোগের লক্ষণ হতে পারে। প্রস্টেট ক্যানসারও তার ব্যতিক্রম নয়।

৩. প্রস্রাবের সময় যদি প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া ও কোনো  রকম ব্যথা বা জ্বালা বোধ করা। মূত্রের সঙ্গে রক্তপাত হওয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘হিমাচুরিয়া’। মূত্রের সঙ্গে রক্তপাত হলে বা মূত্রের রং লাল, গোলাপি কিংবা গাঢ় বাদামি হয়ে গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৪. হাড়ে ব্যথা হলে। বিশেষ করে মেরুদণ্ডে বা কোমরে ব্যথা হলে তা প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিঠের নীচের দিক, কোমর, নিতম্ব, কুচকি ও থাইয়ের ব্যথা প্রস্টেট ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষত, বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গটি অনেক বেশি দেখা যায়।

৫. বীর্যের সঙ্গে রক্ত, তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ।

৬. বার বার প্রস্রাব পাওয়া প্রস্টেট ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষত, রাতের দিকে বার বার মূত্রত্যাগের প্রবণতা দেখা যায় প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্তদের। প্রস্রাব ত্যাগের প্রবণতায় যে কোনও রকম পরিবর্তন এলেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রোস্টেট ক্যান্সার হলে উপরোক্ত লক্ষণগুলো দেখে যায়। এমন কোনো লক্ষণ যদি আপনার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় প্রোস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসা করলে তা ৯৬% নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু, অনেকেই লক্ষণগুলো দেখেও ডাক্তারের পরামর্শ নেন না জন্য এই ক্যান্সার আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয়

বিভিন্ন ধরনের সবজি, যেমন– টমেটো, রসুন, মাশরুম, বেগুন, ব্রুকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় রাখুন। পেঁপে, তরমুজ, আম, বেল খান। সয়া সিড, তিসির বীজ, বাদাম, আখরোট এবং ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ মাছ ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। অনেক চিকিৎসকের মতে, প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে প্রচুর পরিমাণে মাছ খেতে হবে। এছাড়াও গ্রিন টি ক্যান্সারের সেল বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। ক্যান্সার প্রতিরোধে দুগ্ধজাতীয় দ্রব্য, রেডমিট কম খেতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

উপরোক্ত এসব কাজ করলেই প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থাতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। উপরে উল্লিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে রক্তের পিএসএ পরীক্ষা করে আমরা প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে পারি। লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

আমাদের শেষ কথা

ফেরদাউস অ্যাকাডেমির আজকের এই পোস্টে আপনাদের সাথে প্রোস্টেট ক্যান্সার কী, প্রোস্টেট ক্যান্সার কেন হয় এবং এই ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ কী কী তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করছি, আপনি পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়েছেন। আরও এমন বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক পোস্ট পড়তে আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। আল্লাহ্‌ হাফেয।

Leave a Comment