কোরবানির দোয়া ও নিয়ত

সামনেই কোরবানি। কোরবানির দোয়া ও নিয়ত জেনে রাখা আমাদের সকলের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনার যদি কোরবানি করার ইচ্ছে থাকে বা কোরবানির নিয়ত করে থাকেন, তবে কোরবানির দোয়া জেনে রাখা উচিত। কোরবানি একটি তাকওয়া সমৃদ্ধ ইবাদত। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তায়ালা আমাদের মাঝের তাকওয়া দেখেন। কোরবানির পশুর রক্ত কিংবা মাংস আল্লাহ্‌ তায়ালা দেখেন না। আজকের এই পোস্টে আপনাদের সাথে কোরবানির দোয়া এবং কোরবানির নিয়ত নিয়ে আলোচনা করবো। তো চলুন, শুরু করা যাক।

কোরবানির দোয়া ও নিয়ত

কোরবানির দোয়া ও নিয়ত
কোরবানির দোয়া ও নিয়ত

সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা উচিত। আপনি যদি কুরবানি করার নিয়ত করে থাকেন, তবে কোরবানির করার দোয়া মুখস্ত করে নেয়া প্রয়োজন। আল্লাহ্‌ তায়ালার তাকওয়া অর্জন করার জন্য কুরবানি করার ইচ্ছে এবং নিয়ত থাকলে, খাস দিলে নিয়ত করা উচিত। কারণ, কুরবানির নিয়তে যদি গরমিল থাকে কিংবা কুরবানির অর্থে যদি কোনো হারাম অর্থ যুক্ত থাকে, তবে আমাদের কুরবানি কবুল হবে না। তো চলুন, কুরবানির দোয়া ও নিয়ত জেনে নেয়া যাক।

কুরবানির নিয়ত

কুরবানির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিয়ত। কুরবানি করার জন্য আমাদেরকে মন থেকে নিয়ত করতে হবে। মানুষ দেখানো কুরবানি করলে সেটা আমাদের ইহকাল এবং পরকাল কোনো কালের জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। কুরবানির নিয়ত করতে হয় খাস দিলে। আল্লাহ্‌র কাছে নিয়ত করতে হবে, নিজের হালাল উপার্জন দিয়ে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হালাল পশু কুরবানি করছি। নিয়ত এবং অর্থ কোনো জায়গায় গরমিল থাকলে আমাদের কুরবানি কবুল হবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত, রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (অন্তরের বিশুদ্ধতা)।’ -সূরা হজ: ৩৭

অনেকেই সুদের টাকা, হারাম পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজ দেখানো কুরবানি করে থাকেন। তাদের কুরবানি আল্লাহ্‌র কাছে কবুল হয় না। সেই কুরবানি শুধু মাংস খাওয়া কুরবানি হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন – জুমার নামাজ কয় রাকাত এবং নিয়ত

কুরবানি প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নিকট কোরবানির দিন মানবজাতির কোরবানি অপেক্ষা অধিকতর পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। বিচারদিনে কোরবানির পশুকে তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত করা হবে। পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহতায়ালার নিকট তা বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়, সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ -সুনানে তিরমিজি: ১৩৯১

কোরবানির দোয়া

কোরবানি করার সময় একটি দোয়া পড়তে হয়। পশু জবাই করার সময় এই দোয়া পরে কুরবানি সম্পন্ন করতে হবে। আপনি যদি নিজে পশু কুরবানি করেন তবে আপনাকে এই দোয়া পড়তে হবে। কিংবা, যদি কোনো ইমাম বা অন্য কেউ আপনার পরিবর্তে পশু জবাই করে, তাকে এই দোয়া পড়তে হবে। পাশাপাশি আপনিও এই দোয়াটি পড়বেন। নিচে কুরবানির দোয়াটি উল্লেখ করে দিলাম।

وجهت وجهي للذي فطر السموات والأرض حنيفا وما أنا من المشركين، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ، بسم الله الله أكبر.

উচ্চারণ : ইন্নি ওয়াজ জাহতু ওয়াজ হিয়া লিল্লাযি ফাতারাছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহ ইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন।…বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।

অর্থ : নিশ্চয়ই আমি দৃঢ়ভাবে সেই মহান সত্তার অভিমুখী হলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আমি মুশরিকদের অন্তর্গত নই। নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবই বিশ্ব প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ কাজের জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আর আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন। আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৭৮৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২১)

কুরবানির পশু জবাইয়ের নিয়ম

সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। নিজের কুরবানির পশু নিজেই জবাই করা মুস্তাহাব। তবে যদি নিজের দ্বারা জবাই করা সম্ভব না হয়, তবে অন্যের দ্বারা জবাই করানো যাবে। মাংস খাওয়া হালাল এমন স্থলচর পশু বিশেষ করে কুরবানির জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, উট ও দুম্বা ইত্যাদি পশুর কণ্ঠনালী, খাদ্যনালী এবং উভয় পাশের দু’টি রগ অথবা একটি রগ কাটার মাধ্যমে জবাই বা নহর সম্পন্ন হয়। কুরবানির পশু জবাই করার সময় যিনি কুরবানি করছেন, তার সামনে থাকা উত্তম। নিচে আমি কুরবানির পশু জবাইয়ের নিয়ম বিস্তারিত উল্লেখ করে দিলাম।

কুরবানির পশু জবাই করার পদ্ধতি

জবাই করার আগে পশুকে কিবলামুখি করে শোয়াতে হবে। অতঃপর, বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবাই করা। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বলে জবাই করে, তবে জবাইকৃত পশু হারাম বলে গণ্য হবে। আর কেউ যদি ভুলবশত বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে তা খাওয়া বৈধ।

জবাই করার সময় কণ্ঠনালী, খাদ্যনালী, এবং উভয় পাশের দুটি রগ অর্থাৎ মোট চারটি রগ কাটা জরুরি। কমপক্ষে তিন যদি তিনটি রগ কটা হয় তবে কুরবানি শুদ্ধ হবে। কিন্তু যদি দু’টি রগ কাটা হয় তবে কুরবানি দুরস্ত হবে না। (হিদায়া) জবাই করার আগে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেয়া। যেন কুরবানির পশুর কোনো কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এতে করে যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে ছুরি ধরতে হয়, তবে তাকেও বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলতে হবে। এছাড়াও, কুরবানির পশু বড় হলে পশুর পা গুলো ঠিকমতো ধরতে হবে কিংবা বেধে দিতে হবে। এভাবে করেই কুরবানি সম্পন্ন করতে হবে।

আরও পড়ুন – বাংলা এক্সপ্রেস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিস্তারিত

পশু কুরবানি করার পর মাংস ঠিকমতো কেটে বন্টন করতে হবে। কুরবানির মাংস বন্টন করার সঠিক এবং শরিয়া মোতাবেক পদ্ধতি হচ্ছে মাংস ৩ ভাগে বিভক্ত করা। একভাগ মাংস কুরবানি দেয়া ব্যক্তির নিজের পরিবারের জন্য, একভাগ মাংস তার আত্মীয়-স্বজন এর জন্য, বাকী একভাগ মাংস গরিব-মিসকিন মানুষের জন্য। এলাকায় যদি কোনো গরিব-দুঃস্থ থাকে, তবে তাকে কুরবানির মাংস দিতে হবে। অর্থাৎ, প্রতিবেশির হক পূরণ করতে হবে।

কুরবানির পশু জবাই করার পরের দোয়া

উপরে উল্লিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করে কুরবানির পশু জবাই করার সময় একটি দোয়া পড়তে হয়। পোস্টে ইতোমধ্যে আমি কুরবানির দোয়া উল্লেখ করে দিয়েছি। কুরবানির দোয়াটি পরে পশু জবাই করবেন। এরপর, আর একটি দোয়া পড়তে হবে। নিচে আমি কুরবানির পশু জবাই করার পরের দোয়া উল্লেখ করে দিয়েছি।

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিও ওয়া খালিলিকা ইবরাহিমা আলাইহিমাস সালাতা ওয়াস সালাম।

এখানে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে, উপরে উল্লিখিত দোয়াটি যদি কুরবানি যিনি দিচ্ছেন তিনি নিজে পশু জবাই করেন, তখন মিন্নি পড়বেন এবং যদি অন্য কারও হয়ে পশু জবাই করে দেন, তখন মিন পড়তে হবে। যদি না বুঝে থাকেন, তবে একটি উদাহরণ দেই। করিম কুরবানি দিবে। সে পশু কিনে এনেছে। ঈদের দিন যদি সে নিজে পশুটি জবাই করে, তবে উপরে দেয়া দোয়াটি পড়ার সময় মিন্নি পড়বে, যদি রহমত এর দ্বারা পশুটি জবাই করে নেয়, তবে রহমত দোয়াটি পড়ার সময় মিন্নি এর পরিবর্তে মিন পড়বে।

আমাদের শেষ কথা

আজকের এই পোস্টে আপনাদের সাথে কোরবানির দোয়া ও নিয়ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কুরবানি করার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কোরবানির নিয়ত এবং কোরবানির দোয়া। এই দুইটি বিষয়ের দিকে আমাদের বিশেষ নজর দেয়া উচিত। পোস্ট থেকে কুরবানির দোয়া ও নিয়ত জেনে নিয়ে সহিহ ভাবে কুরবানি করতে পারবেন। আজকের মতু এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ্‌ হাফেয।

Leave a Comment